তবুও বৃষ্টি আসুক” …..শফিকুল ইসলাম

 

গ্রন্থ পর্যালোচনা তবুও বৃষ্টি আসুক

       মহিবুর রহিম

কবি, লোকসাহিত্য গবেষক।  

         কবিতা কবির অন্তর্তাগিদের ফসল। কবি তার জীবনাভিজ্ঞতায় যে বাস্তবতার মুখোমুখী হন কবিতা এক অর্থে তারই শিল্প-সম্মত প্রকাশ। জীবনের কত আকাঙ্খা, অনুভূতি, ব্যর্থতা, হতাশা কবিতায় স্থান করে নেয়। কবি তাঁর মুহুর্তের আবেগ থেকে শিল্পের রঙ ছড়িয়ে কবিতার বিষয়কে মুক্তি দিতে সচেষ্ট হন। একজন সাধারণ মানুষ জীবনের যে সব অনুভূতিকে অনায়াসে ছড়িয়ে দেন কালের গহ্বরে, কবি তাকেই বেঁধে নেন বিশেষ ভাষায়, অক্ষরের ফ্রেমে। এই ভাষা অক্ষরের গভীরেও কবি বুনে দেন শিল্প ও নান্দকিতার আকর্ষণ। তাই কবির বিশেষ মুহুর্তটি হয়ে ওঠে চিরন্তন মানুষের চিরকালের অনুভূতি।

শফিকুল ইসলামের তবুও বৃষ্টি আসুক কবিতা গ্রন্থটি পড়তে পড়তে কবিতা সম্পর্কে এমনই ধারণা হওয়া স্বাভাবিক| তবুও বৃষ্টি আসুক শফিকুল ইসলামের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। পূর্বেকার গ্রন্থগুলো হচ্ছে এই ঘর, এই লোকালয়, একটি আকাশ ও অনেক বৃষ্টি এবং শ্রাবণ দিনের কাব্য। তবুও বৃষ্টি আসুক গ্রন্থের কবিতাগুলোই প্রমাণ করে নিজের হৃদয়ে এক আলাদা কবিসত্তাকে লালন করেন তিনি। কবির প্রাত্যহিক ব্যক্তিসত্তা থেকে পৃথক এই কবিসত্তা চিরন্তন মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে আছে। মোট ৪১ টি কবিতা নিয়ে তবুও বৃষ্টি আসুক কাব্যগ্রন্থটি প্রণীত।

এ গ্রন্থের প্রথম কবিতা তবুও বৃষ্টি আসুক। এই কবিতায় কবি সাধারণ মানুষের মতোই বৃষ্টির আকাঙক্ষা করেছেন। দীর্ঘ নিদাঘের পর মানুষের মনে যে বৃষ্টির আকাঙক্ষা জমে থাকে তেমনি। কিন্তু কবির আকাঙক্ষা এই সাধারণ স্বাভাবিক আকাঙক্ষার মধ্যে নিবৃত্ত হয় না। এক তৃষিত অন্তরের মতোই তিনি আকাঙক্ষা করেন বিশ্ব জুড়ে নামুক বৃষ্টি, ক্ষুধা দারিদ্র পীড়িত ইথিওপিয়ায়, সুদানে, দুর্ভাগ্য জর্জরিত আফ্রিকায়। এই আকাঙক্ষা আরও দীর্ঘ পরিসরে আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে বৃষ্টির শুশ্রূাষা কামনা করে। এভাবে নিসর্গ থেকে কবির ব্যক্তিসত্ত্বা হয়ে চিরন্তন মূল্যবোধে উত্তীর্ণ হয়েছে এই কবিতা। এখানেই একজন কবির সার্থকতা।

তার ও আগে বৃষ্টি নামুক

আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে

সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক,

আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা, হৃদয়ের গ্লানি।

মানুষের জন্য মানুষের মমতা

ঝর্ণাধারা হয়ে যাক

বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে।

সব পিপাসার্ত প্রাণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে

বয়ে যাক অনন্ত ধারা জল।

 (তবুও বৃষ্টি আসুক)

তবু ও বৃষ্টি আসুক গ্রন্থের শেষ কবিতা এই গান এই সুর। ছোট্ট এই কবিতায় কবি হৃদয়ের নান্দনিকতায় অধিষ্ঠিত যে প্রেম কিংবা যে সত্য কবিকে প্রতিমুহুর্তে কবি করে তোলে তারই নান্দী রচনা করেছেন। যেমন ঃ-

এই গান এই সুর

এই ফুল এই পাখি

নদী আর নিসর্গ

সবই সুন্দর- শুধু তুমি আছো বলে।

এই দুঃখ এই হতাশা

এই বঞ্চনা এই মৃত্যু

আজ ও সুমধুর- শুধু তুমি ভালবাস বলে।

(এই গান এই সুর)

মানুষের জীবনে যে অনুভূতিকে মহত্তম মানবিক শিল্প বলে বিবেচিত হয়, প্রেম সেই অনুভূতিরই জারক। সেই সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ এক কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও পৃথিবীকে সার্থক করতে সদা সচেষ্ট থেকেছে তার অন্তর্গত ভালবাসার তাগিদে। সৃষ্টির মূলে যেমন এই ভালবাসা, তেমনি শিল্পের প্রেরণাতে ও তারই সুর। শফিকুল ইসলাম চমৎকার ভাবেই অন্তর্গূঢ় সত্যকে তার কবিতায় উপজীব্য করেছেন।

প্রথম ও শেষ কবিতার মধ্যে রয়েছে আরও ৩৯ টি কবিতার অনবদ্য এক ভূবন। কখনো প্রেমের বাসনায় রঞ্জিত হয়ে, ব্যর্থতার ধূসরিমায় দ্বিধাণ্বিত হয়ে কিংবা সর্ব সহিষ্ণু হৃদয়ের আর্তি নিয়ে প্রতীক্ষমান এই কবি। তিনি দ্রোহ আর বিপ্লবের ও নান্দী রচনা করেছেন। সব মিলিয়ে সপ্রাণ কবি চেতনায় উদ্বুদ্ধ শফিকুল ইসলাম।হে জীবন, একদিন তুমি ছিলে কবিতায় তিনি লিখেছেনঃ–

হে জীবন, একদিন তুমি ছিলে

স্বপ্ন আর দুরূহ কল্পনার

অভাবনীয় আর অসম্ভবের –

আর আজ

জীবন প্রণোদিত সংগ্রামে

আমরা প্রতি মুহুর্তে ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত

ক্লান্ত–

হায় জীবন

তুমি কেন হলে না

ছোট্ট একটি মিষ্টি সঙ্গীতের মতো

ছন্দোবদ্ধ একটি কবিতার মতো।

(হে জীবন, একদিন তুমি ছিলে)

একজন বীরযোদ্ধা কবিতায় শফিকুল ইসলাম একজন সার্থক রণজয়ী যোদ্ধার জীবনচিত্র অঙ্কন করেছেন। যে যোদ্ধা স্বদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন শত্রু সৈন্যদের হাত থেকে। স্বদেশের মাটিতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বিশ্বাসঘাতকদের হাতে। আমাদের অনুভূতিকে উষ্ণ করে তোলে শফিকুল ইসলামের এই কবিতা।

তবুও বৃষ্টি আসুক কবিতা গ্রন্থের হৃদয় অধিকার করে আছে আরও বিশেষ একজন। যার নাম সুলতা। যার আবির্ভাব কবির জীবনে সূর্যোদয়ের মতো আর তিরোভাব সূর্যাস্তের মতো। যাকে উপলক্ষ করে কবি হৃদয়ে ফুটে আছে সহস্র ফুল। যার কথা মালায় ছড়িয়ে পড়ে অনেক অনেক পাখি। যার অনুপস্থিতিতে কবি জীবনে নেমে আসে মৃতুহীন মৃত্যু।

শফিকুল ইসলামের তবুও বৃষ্টি আসুক কবিতা গ্রন্থে আপাত সরল কাব্য ভাষায় অনেক ঋদ্ধ কবিতার সন্নিবেশ ঘটেছে। বিশেষ করে তার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে নিসর্গ-শোভিত এক সবুজ অনুভূতির কাছে নিয়ে যায়। বৃষ্টির আকাঙক্ষা, প্রকৃতির সান্নিধ্য, ভালবাসার সংরক্তি শফিকুল ইসলামের কবিতাকে দিয়েছে জগৎ ও জীবনের মায়ায় প্রবেশের ছাড়পত্র।

ভালবাসা চিরদিনই অপরাজেয় এই ধ্রুব সত্যের সত্যতা রক্ষার জন্য এবং ভালবাসাকে ভালবেসে ফিরে আসুক জগতের সকল সুলতা। এই কামনার ভিতরে সমস্ত হতাশা, দুঃখবোধ, বিষন্নতা কবিকে প্রতি মুহুর্তে তাড়িত করছে। আজীবন নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে তিনি গড়ে তোলেছেন স্বপ্নের এক হিরন্ময় সৌধ। সমস্ত ব্যর্থতাকে প্রাণ দিয়েছেন চিরন্তন ভালবাসার মোড়কে। এই ভালবাসারই অনবদ্য আর্তি তবুও বৃষ্টি আসুক।

[গ্রন্থের নাম তবুও বৃষ্টি আসুক, লেখক শফিকুল ইসলাম। প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ। প্রকাশকআগামী প্রকাশনী, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা১১০০। ফোন ৭১১১৩৩২, ৭১১০০২১। মোবাইল ০১৮১৯২১৯০২৪]

তবুও বৃষ্টি আসুকশফিকুল ইসলাম

বহুদিন পর আজ
বাতাসে বৃষ্টির আভাস,
সোঁদা মাটির অমৃত গন্ধ-
এখনই বুঝি বৃষ্টি আসবে
সবারই মনে উদ্বেগ-
তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার ব্যস্ততা।
তবু আমার মনে নেই বৃষ্টি ভেজার উদ্বেগ
আমার চলায় নেই কোনো লক্ষণীয় ব্যস্ততা।

দীর্ঘ নিদাঘের পর
আকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির সম্ভাবনা
অলক্ষ্য আনন্দ ছড়ায় আমার তপ্ত মনে –
আর আমি উন্মুখ হয়ে থাকি
বৃষ্টির প্রতীক্ষায় –
এখনই বৃষ্টি নামুক
বহুদিন পর আজ বৃষ্টি আসুক।

দীর্ঘ পথে না থাকে না থাকুক বর্ষাতি –
বৃষ্টির জলে যদি ভিজে যায় আমার সর্বাঙ্গ
পরিধেয় পোশাক-আশাক-
তবুও বৃষ্টি আসুক –
সমস্ত আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামুক
বৃষ্টি নামুক মাঠ-প্রান্তর ডুবিয়ে।
সে অমিতব্যয়ী বৃষ্টিজলের বন্যাধারায়
তলিয়ে যায় যদি আমার ভিটেমাটি
তলিয়ে যাই যদি আমি
ক্ষতি নেই।

তবুও বৃষ্টি নামুক
ইথিওপিয়ায়, সুদানে
খরা কবলিত, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত
দুর্ভাগ্য জর্জরিত আফ্রিকায়-
সবুজ ফসল সম্ভারে ছেয়ে যাক
আফ্রিকার উদার বিরান প্রান্তর।

তার ও আগে বৃষ্টি নামুক
আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে
সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক,
আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা, হৃদয়ের গ্লানি।

মানুষের জন্য মানুষের মমতা
ঝর্ণাধারা হয়ে যাক
বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে –
সব পিপাসার্ত প্রাণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
বয়ে যাক অনন্ত ধারাজল হয়ে।

বহুদিন পর আজ
অজস্র ধারায় অঝোরে বৃষ্টি নামুক
আজ আমাদের ধূলি ধূসরিত
মলিন হৃদয়ের মাঠ-প্রান্তর জুড়ে ॥

 

Shafiqul Islam
Poet Shafiqul Islam was born on 10th February in Bangladesh. He studied in the University of Dhaka and obtained Master’s Degree in Economics and Social welfare. He also obtained M.A in Islamic Studies from Asian University of Bangladesh. He was awarded Gold Medal for his academic excellence during his study in the university.

Shafiqul Islam is Ex Metropolitan Magistrate and Ex Additional District Magistrate, Ex General Manager at Bangladesh Road Transport Corporation, Now Deputy Secretary of the Government of the people’s
Republic of Bangladesh.

He is a Poet and Lyricist of Bangladesh Radio and Television. Awarded "Bangladesh Council Literature Award" in 1981 and "Nazrul Gold Medal Award" in 2009 for his poetic excellence.

Written some books of poetry...
"Tobu O Bristy Asuk (Let There Be Rain), "Srabon Diner Kabbo (Song of Rainy Days), "Dohon Kaler Kabbo (Verses of Firey Days) and "Protoyee Jatra (Indomitable Journey).
A collection of songs: "Megh Bhanga Roddur (Sunlight on Cloud)

Email: [email protected]
0 Comments

Leave a reply

CONTACT US

We're not around right now. But you can send us an email and we'll get back to you, asap.

Privacy Policy   |  ©2017 Promocave   |  All Rights Reserved

Shares
or

Log in with your credentials

or    

Forgot your details?

or

Create Account